শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল :: অভিযোগ পেলেই নড়েচড়ে বসেন। প্রয়োজন হলে অপেক্ষা না করে ছুটে যান ঘটনাস্থলে। সরকারি দপ্তরে দায়িত্বে গাফিলতি কিংবা অনিয়ম চোখে পড়লে নেওয়া হচ্ছে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কোথাও কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে অনুপস্থিত, কোথাও সরকারি নথি ও দেওয়ানি মামলার প্রতিবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা—কোনো বিষয়ই যেন নজর এড়াচ্ছে না বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদের।
দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আকস্মিক পরিদর্শন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছেন তিনি। ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চরিত্র ‘ফাটাকেষ্ট’ অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর অবস্থানের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সেই চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করেই রূপক অর্থে অনেকে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে ‘ফাটাকেষ্টের ভূমিকায়’ বলে আলোচনা করছেন।
২০তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. খলিল আহমেদকে গত ২২ এপ্রিল বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভাগের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে নজরদারি বাড়িয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ভূমি অফিসগুলোতে আকস্মিক পরিদর্শন এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বেশ আলোচনায় এসেছে।
বিভাগীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এসব পরিদর্শনে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নয়, সরকারি নথিপত্র, দেওয়ানি মামলার প্রতিবেদন, অফিস পরিচালনা, সেবাপ্রার্থীদের সেবা প্রদান এবং দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ জুলাই বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা আছমা আক্তারকে আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এরপর ২৭ জুলাই সরকারি খাসজমি নিয়ে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় হিজলার ধুলখোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা শঙ্কর চন্দ্র মালাকারকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়।
পটুয়াখালীতেও ভূমি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ছয় ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বছরের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) পরিবর্তনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শাস্তির মেয়াদে তাঁদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনা না করার কথা জানানো হয়েছে।
দেওয়ানি মামলার প্রতিবেদন ও দফাওয়ারি জবাব দাখিলে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নলছিটির আঃ মালেককে একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পরও দেওয়ানি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন যথাসময়ে দাখিল না করায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগে নলছিটির মো. সরোয়ার হোসেনকেও শোকজ করা হয়েছে।
অন্যদিকে কলাপাড়ার মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মো. আসিফ নূরকে নয়টি দেওয়ানি মামলার দফাওয়ারি জবাব দিতে এক বছরের বেশি সময় কালক্ষেপণের অভিযোগে গত ৩১ আগস্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা ঘটে ৮ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগড় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। সকাল ৯টার দিকে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার দেখতে পান, অফিসে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই। এমনকি অফিসের দরজাতেও ঝুলছিল তালা। পরে স্থানীয় এক দপ্তরি এসে তালা খুলে দেন।
পরিদর্শনের সময় ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন খানও কর্মস্থলে ছিলেন না। এ ঘটনায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এর এক দিন পর, ৯ সেপ্টেম্বর সকালে বরিশাল সদর উপজেলার আমানতগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন চালানো হয়। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ওবায়দুল্লাহ সেখানে গিয়ে উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা শিমুল পাইন শান্তা ও অফিস সহায়ক মো. মজিবুর রহমানকে কর্মস্থলে পাননি। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে একই দিন তাঁদের দুজনকে বদলি করে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ২৫৪টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, সেবার মান এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে। বিভাগীয় প্রশাসনের এ মনিটরিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। আগাম নোটিশ ছাড়াই যেকোনো দিন বিভাগের বিভিন্ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন হতে পারে।
এতে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা সরকারি সেবা প্রদানে অনিয়মের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের ধারাবাহিক এই তৎপরতায় মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে জবাবদিহিতার চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলেই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। অভিযোগ যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রক্রিয়াগত বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকারি দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, নথি বা মামলা নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জনগণকে সেবা দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগাম নোটিশ ছাড়াই বিভিন্ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে।’
প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভাগীয় কমিশনারের অন্যতম দায়িত্ব হলো অধীনস্থ প্রশাসনিক কার্যক্রমের তদারকি করা। নিয়মিত তদারকি, আকস্মিক পরিদর্শন, অভিযোগের দ্রুত অনুসন্ধান এ