শিরোনাম
সমগ্র বিশ্ব যেখানে কাঁদছে! মৃত্যুমিছিলে লাশ কাঁধে নিতেও যখন মানুষ ভয় পাচ্ছে! মানুষ মৃত্যু আতংকে যখন ছটফট করছে; ঠিক তখনই এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী আমাদের মত একটি মধ্যম আয়ের দেশের মানুষের সাথে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে! হায়রে দেশপ্রেম!
যেখানে দুস্থ, গরীব, অসহায় ও কর্মহীন মানুষদের জন্য সরকার ত্রান-সাহায্য থেকে শুরু করে জাতিকে করোনা মুক্ত রাখতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন সেখানে অনেক অসাধু ব্যক্তিরা; কেউ কেউ ত্রানের চাল, কেউ দৈনিন্দন পণ্য সামগ্রী, কেউ ঔষধ ইত্যাদি নিয়ে কেলেংকারী শুরু করেছেন!
একবার লিখেছিলাম, ভাইয়েরা! বেঁচে থাকলে আবার চুরি করতে পারবেন। এই মহামারি সংকটে চুরি না করে, প্রতারণা না করে, আল্লাহকে ভালোবেসে হলেও দেশের মানুষকে বাঁচান। নিজে বাঁচুন। আসুন, সবাই প্রয়োজনে এক বেলা খাই। তবুও সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকি! কিন্তু আমাদের অবস্থা ও চরিত্র এতই খারাপ যে চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী!
এবার মূল আলোচনায় আসি।
করোনা আতংক ছড়িয়ে পড়লে দেশের অধিকাংশ ফার্মেসী ও কারখানা থেকে প্রাইভেট ক্লিনিক, বিত্তশালী সহ কিছু সচেতন মধ্যবিত্ত ও ফার্মেসী মালিক বিভিন্ন কোম্পানির হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে স্ব স্ব স্থানে মজুদ করেন। মার্কেট খালি করে ফেলেন। তৈরি হয় সংকট। গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তদের কথা কেউ কেউ ভাবলেও অধিকাংশরাই ভাবলেন না! এর পর ফার্মেসীগুলোতে তিন থেকে পাঁচ গুণ দামে বিক্রি হতে লাগলো এই স্যানিটাইজার! উল্লেখ্য, একই সাথে স্যাভলন, ডেটল সহ অন্যান্য জীবানু নাশকও বাজার শূন্য হয়ে পড়ে।গত ১৮ মার্চ এই পর্ব শেষ!
এখন বাজারে যে সমস্ত 100 mL হ্যান্ড স্যানিটাইজার এসেছে তার খুচরা মূল্য ১০০ থেকে ১২০ টাকা। 200 mL ২০০ থেকে ২২৫ টাকা। এক মাস আগেও এর মূল্য ছিলো কত? তাদের প্রত্যেকের প্রস্তুতপ্রণালীতে লেখা আছে, WHO ( World Health Organisation) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফর্মুলা অনসারে তারা 75% আইসোপ্রোপাইল অ্যাএলকোহল ( রাবিং এলকোহল) 2% গ্লিসারিন এবং 5% হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিচ্ছেন। যেহেতু এই মুহূর্তে আইসো প্রোপাইল এলকোহল বা রাবিং এলকোহলের সংকট, দাম অনেক বেশি সেক্ষেত্রে কোম্পানি গুলো ইথাইল এলকোহল দিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রস্তুত করতে পারেন। কেউ কেউ ইথাইল এলকোহল ( ৯৬%) দিয়ে প্রস্তুত করছেন এবং প্রস্তুত প্রনালীর উপাদান সমুহের মধ্যে ইথাইল এলকোহল উল্লেখ করেও দিচ্ছেন। তাদেরকে সত্য লেখার জন্য ধন্যবাদ যদি লেখার সাথে উপাদানের সাথে সত্যিকারের মিল থাকে!
আমি ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি কোম্পানির হ্যান্ড স্যানিটাইজারে লক্ষ্য করলাম তাতে আইসোপ্রোপাইল এলকোহলতো দূরের কথা! ইথানলও নেই। অধিকাংশ হ্যান্ড স্যানিটাইজার মিথানল দিয়ে প্রস্তুত। মেরেটিং ব্লু মিশানো বিষাক্ত মিথানল যার সাথে ৫০% পানি সহ একটু সুগন্ধি যোগ করে বাজারজাত করছেন। একজন উচ্চমাধ্যমিক রসায়নের ছাত্রকেও যদি ইথানল ও মিথানলের সনাক্তকারী পরীক্ষা, ধর্ম, বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য সম্পর্কে বলা হয় তারা নিমিষেই তা করে দেবে! এতে মালিকের আজ্ঞাবহ কেমিস্ট বা ফার্মাসিস্ট হওয়ার দরকার নাই।
যাদের মধ্যে দেশপ্রেম নাই। মানুষের জীবনের কোন মূল্য নাই! তাদের উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে কি লাভ হয়েছে বলতে পারেন?
নিয়মানুযায়ী এই স্যানিটাইজার তৈরি থাকলে এবং তা দিয়ে হাত ধুয়ে যে কোন খাবার খাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ হ্যান্ড স্যানিটাইজার দ্বারা হাত ধুয়ে যদি ঐ হাত পরিস্কার করার জন্য আবার বল সাবানেরই দরকার হয়। তাহলে বল সাবানই দিয়েই সরাসরি হাত ধোয়াই ভালো না?
ক্ষতি কি জানতে চান?
মিথানল মিশ্রিত হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাচ্চাদেরই বেশি ক্ষতি করে!!
এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে যদি হাত দিয়ে কোন খাবার খান তবে তার পেটে ব্যাথা, বমিবমি ভাব, ক্ষুদামন্দা, পাতলা পায়খানা, আমাশুয় হবে। বিশেষ করে শিশুরা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, হবে। অধিকাংশ শিশুর বমি হতে পারে। মিথানল পেটে গেলে শিশুরা খাবার খাইতে চাইবে না। পেটে ব্যাথা বলবে। পাতলা পায়খানা হবে।
ইথানল (CH3CH2OH) বিষাক্ত নয় কিন্তু মিথানল ( CH3OH) বিষাক্ত! আপনারা প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় শুনে থাকবেন মদ্যপানে অমুক ব্যক্তির মৃত্য, বা হাসপাতালে ভর্তি কিংবা চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে! এটা মূলত ভূল বসত ইথানলের জায়গায় মিথানল পানের কারণেই হয়েছিল বা হয়!
আর সেই মিথানলের গন্ধ ঢাকার জন্য কিছু কোম্পানি হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ইদানীং সুগন্ধি ব্যবহার করছেন আর ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর জন্য 100 mL হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মধ্যে ৫০% পানি মিশ্রিত করছেন!!
আসলে আমার এই লেখাটা বন্ধুদের কোন কাজেই দেবে না। কারণ যে দেশের জনগণ তো দূরের কথা কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য, ঔষধ ও খাদ্য নিরাপত্তায় যোগ্য জনবলের অভাবে কিংবা স্বদিচ্ছার অভাবে প্রিজারভেটিভস এবং ভেজাল সম্পর্কে সচেতন হন না, সচেতন হবেন না, সচেতন নন সেখানে আমার মত ক্ষুদ্র এই শিক্ষকের কথা কে শুনবে!! অবশেষে আমার সত্যি কথায় কেউ কষ্ট নেবেন না! সবাই অন্তত ইথানল দিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রস্তুত করবেন এই প্রত্যাশাই করি।
– আমিনুর রহমান শামীম
প্রভাষক, রসায়ন বিভাগ, চাঁদপাশা স্কুল এন্ড কলেজ, বাবুগঞ্জ, বরিশাল।