জনি আলমগীর কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:: সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও বিদ্যমান আইন উপেক্ষা করে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর, আলীপুর, কুয়াকাটা ও আশাখালী উপকূলে অবাধে চলছে অবৈধ ও রূপান্তরিত ‘আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের’ কার্যক্রম। নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, চিংড়ির রেণুসহ সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য আহরণ করায় মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে মাছের উৎপাদনে, আর জীবিকা সংকটে পড়ছেন হাজারো উপকূলীয় জেলে।
বাড়ছে অবৈধ ট্রলিং বোটের সংখ্যা
স্থানীয় জেলে ও মৎস্যসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছর মহিপুর-আলীপুর অঞ্চলে প্রায় ৪০–৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় থাকলেও চলতি বছরে তা বেড়ে ৬০–৬৫টিতে পৌঁছেছে। অধিক মুনাফার আশায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাধারণ কাঠের ট্রলারকে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে।
নিয়ম অনুযায়ী এসব বোটের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা উপকূলের অগভীর জলসীমায় জাল ফেলছে। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হুমকিতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রলিং বোটে ব্যবহৃত ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভারী জাল সমুদ্রতলের প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং অণুজীবের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে দেয়। ফলে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এছাড়া ফিস ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মাছের ঝাঁক সহজেই শনাক্ত করে ব্যাপক হারে আহরণ করা হচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র জেলেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।
মহিপুর ও আলীপুরের জেলেদের অভিযোগ, বড় ট্রলিং বোট প্রায়ই তাদের জালের ওপর দিয়ে চলাচল করে লাখ লাখ টাকার জাল নষ্ট করে দেয়। প্রতিবাদ করলে হুমকি-ধমকিরও শিকার হতে হয়।
জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা দিনের পর দিন সমুদ্রে গিয়েও মাছ পাই না। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে সাগরের মাছ ও পোনা নিধন করছে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই এসব বন্ধ করতে পারে।
জেলে আবুল কাশেম বলেন, ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে জেলেদের মাছ ধরার মতো কিছুই থাকবে না।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র দূষণ এবং অবৈধ ট্রলিং—এই তিন কারণে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ডিমওয়ালা মা মাছ ও পোনা নিধনের ফলে ইলিশ, পোয়া, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি আয় ও নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও হুমকির মুখে পড়বে।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তবে প্রমাণ মেলেনি
জেলেদের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও নৌ-পুলিশের একটি অংশের পরোক্ষ সুবিধার কারণেই বছরের পর বছর অবৈধ ট্রলিং চললেও এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মহিপুর মৎস্য আড়ৎ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা বলেন, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে বহুবার আলোচনা হলেও কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। কঠোর নজরদারি ছাড়া এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
ফিশারিজ কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ বলেন, অবৈধ জালের কারণে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন হচ্ছে। তাই কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া মৎস্যসম্পদ রক্ষা সম্ভব নয়।
কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, ট্রলিং বোট সংক্রান্ত মামলা আদালতে বিচারাধীন। অবৈধ মৎস্য শিকার রোধে অভিযান চললেও গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ট্রলিং বোটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ সংকটে পড়বে। এর প্রভাব শুধু পরিবেশেই নয়, দেশের অর্থনীতি ও উপকূলীয় লাখো মানুষের জীবিকায়ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
####
জনি আলমগীর
কুয়াকাটা পটুয়াখালী প্রতিনিধি
২৯/০৬/২০২৬