প্রতিনিধি বাউফল::পটুয়াখালীর বাউফলের ৪৫টি মা ও শিশু স্বাস্থ্য কমিউনিটি ক্লিনিকের বেহাল অবস্থা। এসব ক্লিনিকে শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য শিক্ষা পরামর্শে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা মানুষগুলো। স্বাস্থ্য সেবা প্রার্থীরা চাহিদানুযায়ী সেবা না পাওয়ায় ভেস্তে যাচ্ছে সরকারে লক্ষ্য উদ্দেশ্যে। কমিউনিটি ক্লিনিক অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখা, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) নিয়মিত না আসা ও বিনামূল্যের ঔষধ বিতরণ ও ডাক্তারের শরনাপন্ন হওয়া অবদি অর্থ আদায়ে স্বাস্থ্য সেবা প্রার্থিরা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
জানা গেছে, প্রান্তিক মানুষের দোর গোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যে এ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে ৪৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে, নির্মাধীন রয়েছে আরও ৩টি। স্বাস্থ্য বিভাগের কাগজে কলমে সপ্তাহের শুক্রবার ব্যাতীত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এসব ক্লিনিক খোলা রাখার কথা। সপ্তাহের ৬দিন একজন কমিউনিটি হেলথ প্রোভাইডার, সপ্তাহের ৩দিন একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও একজন পরিবার কল্যাণ সহকারি দায়িত্ব পালন করার কথা। তাদের কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সপ্তাহে ১জন মেডিকেল অফিসার এসব কেন্দ্র পরিদর্শনের কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্নই উল্টো। অধিকাংশ ক্লিনিকেই সময়মতো দায়িত্বপ্রাপ্তরা আসেন না। দুই একটিতে আসলেও দুপুর ১২টার পর সেখানে আর কাউকে খূঁজে পাওয়া যায়না। সরকার নির্ধারিত ২৭ ধরনের ঔষধ দিলেও ক্লিনিকগুলোতে সেবা প্রার্থীরা পাচ্ছেন মাত্র দুই থেকে তিন ধরনের ঔষধ। ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনণ স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরামর্শ সহ বিভিন্ন সেবা প্রদানের কথা রয়েছে। অথচ ক্লিনিকের অযতœ অবহেলা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের দুর্নীতি ও অনিয়মের দরুন অভিভাবকহীন হয়ে পরেছে ক্লিনিকগুলো। যে কারনে ভেঙ্গে পরেছে তৃনমূলের স্বাস্থ্য সেবা; প্রান্তিক জনগোষ্ঠি পাচ্ছেনা কাঙ্খিত সেবা। উপজেলার কাছিপাড়া ইউনিয়নে ৪টি, কনকদিয়া ২টি, মদনপুরা ৩টি, দাশপাড়া ৩টি, কেশবপুর ৫টি, চন্দ্রদ্বীপ ১টি, কালিশুরী ৩টি, বগা ২টি, আদাবাড়িয়া ৪টি, সূর্যমনি ৩টি, ধুলিয়া ৩টি, দাশপাড়া ৩টি, কালাইয়া ৩টি, নাজিরপুর ৩টি ও সদর ইউনিয়ন বাউফলে ৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। ৪৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ১৫টি ক্লিনিকের কার্যক্রম ধারাবাহিকতা রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পৌনে ৪ কিলোমিটার দূরত্বে কালাইয়া বন্দরে চন্দ্রদ্বীপ ট্রলারঘাট। উপজেলা সদরের মূলভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চন্দ্রদ্বীপ পৌঁছাতে সাড়ে ৪ কিলোমিটার নদীপথে পাড়াপার একমাত্র ট্রলারে ব্যবস্থা। চন্দ্রদ্বীপ ট্রলার ঘাট থেকে ২ কিলোমিটার দূরত্বে চর ওয়াডেল কমিউনিটি ক্লিনিক। সপ্তাহে মঙ্গলবার একদিন খোলা হয় ক্লিনিক। মাঝে মধ্যে রবিবারও খোলা থাকে। ক্লিনিকে ১০টাকা নিয়ে রোগী দেখেন ডাক্তার। যারা ঔষধের টাকা দেয় তাদের ঔষধ দেয়, যারা টাকা দেয়না তাদের বাহির থেকে ঔষধ কিনতে হয়। একই এলাকার ফাতেমা বেগম জানায়, “চল্লিশ-পঞ্চাশ টাহা (টাকা) পথভাড়া দিয়া ক্লিনিকে আইলে দুই-তিন টাহার ওষুদ (ঔষধ) দেয়। এইডা নাই ওইডা নাই (এটা ওটা নাই) হ্যার চেয়ে (তার চেয়ে) বাউফল হাসপাতালে যাওয়া ভাল।” সরেজমিনে গিয়ে বেলা সোয়া ১১টায় দেখা যায় কালাইয়া বন্দরের অদূরে শরীফবাড়ির সামনের কমিউনিটি ক্লিনিকটি তালাবদ্ধ। সিএইচসিপি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় তিনমাসের মধ্যে মঙ্গলবার টিকা কার্যক্রমের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল। আবার কবে খুলবে এলাকাবাসী জানেনা। বেলা পৌনে ১২টায় কর্পূরকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিক গিয়ে দেখায় যায় তালাবন্ধ। ওই এলাকার হোসনেয়ারা বেগম জানান, পুরো মাস ধরেই বন্ধ রয়েছে। মাঝে মধ্যে খুলে, আমরা গেলে জ্বরের মধ্যে প্যারাসুট গেস্ট্রিকের মধ্যেও প্যারাসুট (প্যারাসিটামল) আর নিলা নিলা দুই একটা ঔষুধ দেয়। দুপুর সাড়ে বারটায় খেঁজুরবাড়িয়া কমিউনিটি ক্লিনিকটি খোলা পাওয়া গেলেও সিএইচসিপিকে পাওয়া গেলনা। কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা দিতে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) ছিলেন অনুপস্থিত। সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষগুলো জানান, সরকার ক্লিনিক ও জনবল দিলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়োগ দেয়ার ফলে অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। আবার অধিকাংশরাই রাজনৈতিক মিটিং মিছিলে সময় পাড় করেন। প্রভাবশালীদের নিয়োগ না দিয়ে প্রকৃত মেধাবীদের চাকুরী হলে ক্লিনিকগুলোর কাঠামোর সাথে স্থানীয়রাও সর্বদা চিকিৎস্যা সেবা পেতো। দাশপাড়া ইউপির খ ইউনিটের এফডাবিøউএ রেহেনা বেগম জানান, সিএইচসিপি অসুস্থ্য থাকায় ক্লিনিকে আসতে পারেনি। তবে এখানে অনেক রুগি হয়। প্রায় ১৯ ধরনের ঔষধ দিয়ে থাকি। অন্য ক্লিনিকগুলোর অনুপস্থিতির কথা বলতে পারবনা। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার সাহা সমস্যার কথা স্বীকার করে ভোরের পাতাকে বলেন, আমাদের একটু সমস্যা আছে। আমরা চেষ্টা করছি ওভার কাম করার জন্য এবং সঠিক ভাবে তদারকির মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের মনোনিবেশ করাতে।
২১-০৫-২০২২