বেলাল আহাম্মেদ শান্ত: খাজা মইনুদ্দিন চিশতী ৫৩৬ হিজরী/১১৪১ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পারস্যের সিসটান রাজ্যের চিশতীতে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি পারস্যে বেড়ে উঠেন। পনেরো বছর বয়সে তার পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে একটি উইন্ডমিল ও একটি ফলের বাগান উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন। কিংবদন্তী অনুসারে, একদিন তিনি তাঁর ফলবাগানে পানি দিচ্ছিলেন তখন তার ফলবাগানে আসেন বিখ্যাত সুফি শেখ ইবরাহিম কুন্দুজী (কুন্দুজী নামটি জন্মস্থান কুন্দুজ থেকে এসেছে)।
যুবক মইনুদ্দিন তটস্থ হয়ে যান এবং কুন্দুজীকে কিছু ফল দিয়ে আপ্যায়ন করেন। এর প্রতিদানস্বরূপ কুন্দুজী মইনুদ্দিনকে এক টুকরা রুটি দেন ও তা খেতে বলেন। এই পর তিনি তার সম্পত্তি এবং অন্যান্য জিনিসপত্র গরীবদের মাঝে বিতরণ করে দেন।
এরপর তিনি বিশ্বের মায়া ত্যাগ করে জ্ঞানার্জন ও উচ্চ শিক্ষার জন্য বুখারার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
খাজা মইনুদ্দিন চিশতী হলেন চিশতীয় ধারার ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি সাধক।
তিনি ১১৪১ সালে জন্মগ্রহণ করেন ও ১২৩৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি গরিবে নেওয়াজ নামেও পরিচিত। মইনুদ্দিন চিশতীই উপমহাদেশে প্রথম এই ধারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করেন।
তিনি ভারতে চিশতী ধারার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ধারা বা সিলসিলা এমনভাবে পরিচিত করেন। পরবর্তীতে তাঁর অনুসারীরা যেমন, বখতিয়ার কাকী, বাবা ফরিদ, নাজিমদ্দিন আউলিয়াসহ (প্রত্যেকে ক্রমানুযায়ী পূর্ববর্তীজনের শিষ্য) আরো অনেকে ভারতের ইতিহাসে সুফি ধারাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে চিশতীয়া তরীকার অপর প্রসিদ্ধ সুফি সাধক খাজা উসমান হারুনীর নিকট মুরীদ হন/শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
তার সেবায় ২০ বছর একাগ্রভাবে নিয়োজিত ছিলেন। পরে উসমান হারুনী তাকে খিলাফত বা সুফি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেন।
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে কিংবদন্তিতুল্য একজন ঐতিহাসিক সুফি ব্যক্তিত্ব।
তিনি স্বীয় পীর উসমান হারুনীর নির্দেশে ভারতে আগমন করে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তারই মাধ্যমে বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। তার বিখ্যাত একটি গ্রন্থ হল “আনিসুল আরওয়াহ”।তিনি কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকীকে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পন করে সিলসিলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন।
আজমীর শরীফ দরগাহ (Ajmer Sharif Dargah), হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (র:) এর দরগাহ যা খাজা বাবার মাজার নামেও পরিচিত। এটি ভারতের রাজস্থানের আজমীর জেলায় অবস্থিত।
ভারতবর্ষের একমাত্র সর্বধর্ম মিলনক্ষেত্র এই আজমীর। হিন্দু, মুসলিমসহ সকল সম্প্রদায়ের কাছে মহান তীর্থস্থান আজমীর। সারা বছরই লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রান মানুষের পদভারে মুখরিত থাকে মাজার কমপ্লেক্স।
সর্বধর্মের এমন মিলনক্ষেত্র পৃথিবীতে ২য় আছে কিনা সন্দেহ। শ্বেত মর্মরের সমাধিবেদী, রূপার রেলিং, সোনায় মোড়ানো সিলিং, রূপার পাতে মেড়ানো এর বুলুন্দ দরজা। ১২৩৬ এ ইলতুতমিশের হাতে শুরু হয়ে ১৬ শতকে সম্রাট হুমায়ুনের হাতে এই বুলুন্দ দরজার কাজ শেষ হয়। মাজারের প্রবেশ ফটকটি হায়দ্রাবাদের নিজাম তৈরি করেন। সম্রাট আকবর ১৫৬৭ সালে ৩০ মিটার উচুঁ মূল প্রবেশ পথের বুলুন্দ দরজাটি তৈরি করেন।
আজমীরের খাজা বাবার মাজারের আরেকটি দর্শনীয় বস্তু হলো ১২০ মন ও ৮০ মন চাউলের বিরিয়ানী রান্না করার দুটি হান্ডা (ডেকচি)। প্রতি বছর ১-৬ রজব তার ওফাত দিবসে এখানে ওরশ অনুষ্ঠিত হয়।
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী বহু দেশ ভ্রমণ করেন। তৎকালীন বিভিন্ন জ্ঞানী, গুণী, পন্ডিত, দার্শনিকসহ অসংখ্য সুফি সাধকের সাথে সাক্ষাত করেন বলে নানা গ্রন্থে তথ্য পাওয়া যায়।
তিনি ইরাকের বাগদাদে আবদুল কাদির জিলানীর সাহচর্যে ৫৭ দিন অবস্থান করেন। তাঁর জীবনীতে বর্ণিত আছে যে, এ সময় আব্দুল কাদির জিলানী তাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ইরাকের দায়িত্ব শায়েক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীকে আর হিন্দুস্থানের দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো।
একই সংবাদ নিজ পীর খাজা ওসমান হারুনীর সাথে মদীনায় অবস্থান ও জিয়ারতকালে নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর পক্ষ থেকে পেয়েছিলেন। তিনি আরব হতে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান হয়ে প্রথমে লাহোর পরে দিল্লী হয়ে আজমিরে বসতি স্থাপন করেন।
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী ৬৩৩ হিজরীর ৫ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ৬ রজব সূর্যোদয়ের সময় ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। বড় ছেলে খাজা ফখরুদ্দীন চিশতী তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন। প্রতিবছর ১লা রজব হতে ৬ রজব পর্যন্ত আজমির শরীফে তার সমাধিস্থলে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। নানা ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হতে সমবেত হয়...... খাজা গরীবে নেওয়াজ এর জীবন বৃত্তান্ত থেকে....
বেলাল আহমেদ শান্ত....
চিশতিয়া নিজামী রিন্দা কওম দরবার শরীফ। সাগরদি দরগাহ বাড়ি ২৩নং ওয়ার্ড বরিশাল।